Dhaka 9:45 am, Tuesday, 10 February 2026

একজন নারী একা হলে, এই সমাজ কতটা নিষ্ঠুর?

  • Reporter Name
  • Update Time : 06:53:05 pm, Saturday, 31 January 2026
  • 40 Time View

শিমু বিল্লাহ : একজন নারী একা হলে এদেশের সমাজ কতটা ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর তা রিমুর রোজা খনকারের জীবন থেকে বুজা যায়। রিমুর কাহিনি নীচে তোলে ধরা হল:

রিমু রোজা খন্দকার জন্মেছিলেন আলোতে—কারণ তার মা ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিন্সেস টিনা খান। কিন্তু ১৯৮৯ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যু সেই আলো নিভিয়ে দেয়। যাওয়ার আগে মা মেয়ের জন্য চকলেট কিনেছিলেন, কপালে চুমু দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। বিঁধে আছে।

মায়ের পর বাবাও পাশে থাকেননি। সেনাবাহিনীর চাকরি, সৌদি আরব, দ্বিতীয় বিয়ে—সব মিলিয়ে রিমু হয়ে পড়েন অপ্রয়োজনীয়। শেষ পর্যন্ত জায়গা হয় টাঙ্গাইলের ভারতেরশ্বরী হোমসে। সেখানে কাটে শৈশব–কৈশোর। ঈদের দিন নতুন জামা ছিল না, শিক্ষকের দেওয়া একটি লাল স্কার্টেই কাটত উৎসব।

ম্যাট্রিকের পর আসে প্রথম প্রেম—নিজের কাজিন ভাইয়ের সঙ্গে ৮ বছরের সম্পর্ক। পড়াশোনার সাহায্যের অজুহাতে, অভিভাবক সেজে মানসিক নিয়ন্ত্রণ। একদিন জানা যায়, সে ইতিমধ্যে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। তবুও যোগাযোগ, টাকা দিয়ে মোহ তৈরি—শেষ পর্যন্ত রিমু বুঝতে পারেন, এটা ভালোবাসা নয়, এটা ব্যবহার।

জীবনের তাগিদে কাজ শুরু—
১৫০০ টাকার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকতা,
তারপর বায়িং হাউস, টেক্সটাইল কোম্পানিতে পিএস-এর চাকরি।এক বেলজিয়ান বায়ার-এর অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি চলে যায়।

পাইলট হওয়ার স্বপ্নে কেবিন ক্রু ট্রেনিং—সেখানেও নোংরা প্রস্তাব, ক্ষমতার অপব্যবহার। এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দামী পোশাক উপহার দিয়ে অফিসে একা ডেকে নিয়ে হেনস্তা করার চেষ্টা করে—তিনি পালিয়ে বাঁচেন।

মিডিয়াতে আসেন মামা আক্তারুজ্জামান-এর মাধ্যমে। কিন্তু ‘হাস্কি’ কণ্ঠস্বরের কারণে নায়িকা হিসেবে সুযোগ কম। তবুও ‘এফএনএফ’, ‘আরমান ভাই’ নাটকে কাজ করে পরিচিতি পান। এখানেও ভালো কাজের বিনিময়ে ‘কোয়ালিটি টাইম’-এর প্রস্তাব ছিল বাস্তবতা।

সবচেয়ে বড় আঘাত আসে বিশ্বাস থেকে। বিদেশে যাওয়ার আশায় একজন প্রতারককে দিয়ে দেন ৭ লক্ষ টাকা ও মায়ের দেওয়া ১৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। সে সব নিয়ে উধাও হয়ে যায়।

আজ রিমু রোজা খন্দকার একা।
কোনো পরিবার নেই, নিরাপদ আশ্রয় নেই।
নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছেন, একটি ক্লদিং পেজ চালাচ্ছেন।

সাক্ষাৎকারের শেষে তার কথাটা ভয়ের—
এই এপিসোড প্রচার হওয়ার পর তিনি বেঁচে থাকবেন কি না, জানেন না।কারণ তিনি প্রভাবশালীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন।তার ভাষায়,“আমার পিছুটান আর নেই, যদি আমাকে মেরেও ফেলে অবাক হওয়ার কিছু নাই।”

এই গল্পটা সহানুভূতির জন্য নয়।
এই গল্পটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য—
একজন নারী একা হলে, এই সমাজ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে।আর আমরা যদি এসব শুনেও নীরব থাকি,
তাহলে দায় শুধু তাদের না—আমাদেরও।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Sadaia jahan

একজন নারী একা হলে, এই সমাজ কতটা নিষ্ঠুর?

Update Time : 06:53:05 pm, Saturday, 31 January 2026

শিমু বিল্লাহ : একজন নারী একা হলে এদেশের সমাজ কতটা ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর তা রিমুর রোজা খনকারের জীবন থেকে বুজা যায়। রিমুর কাহিনি নীচে তোলে ধরা হল:

রিমু রোজা খন্দকার জন্মেছিলেন আলোতে—কারণ তার মা ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিন্সেস টিনা খান। কিন্তু ১৯৮৯ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যু সেই আলো নিভিয়ে দেয়। যাওয়ার আগে মা মেয়ের জন্য চকলেট কিনেছিলেন, কপালে চুমু দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। বিঁধে আছে।

মায়ের পর বাবাও পাশে থাকেননি। সেনাবাহিনীর চাকরি, সৌদি আরব, দ্বিতীয় বিয়ে—সব মিলিয়ে রিমু হয়ে পড়েন অপ্রয়োজনীয়। শেষ পর্যন্ত জায়গা হয় টাঙ্গাইলের ভারতেরশ্বরী হোমসে। সেখানে কাটে শৈশব–কৈশোর। ঈদের দিন নতুন জামা ছিল না, শিক্ষকের দেওয়া একটি লাল স্কার্টেই কাটত উৎসব।

ম্যাট্রিকের পর আসে প্রথম প্রেম—নিজের কাজিন ভাইয়ের সঙ্গে ৮ বছরের সম্পর্ক। পড়াশোনার সাহায্যের অজুহাতে, অভিভাবক সেজে মানসিক নিয়ন্ত্রণ। একদিন জানা যায়, সে ইতিমধ্যে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। তবুও যোগাযোগ, টাকা দিয়ে মোহ তৈরি—শেষ পর্যন্ত রিমু বুঝতে পারেন, এটা ভালোবাসা নয়, এটা ব্যবহার।

জীবনের তাগিদে কাজ শুরু—
১৫০০ টাকার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকতা,
তারপর বায়িং হাউস, টেক্সটাইল কোম্পানিতে পিএস-এর চাকরি।এক বেলজিয়ান বায়ার-এর অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি চলে যায়।

পাইলট হওয়ার স্বপ্নে কেবিন ক্রু ট্রেনিং—সেখানেও নোংরা প্রস্তাব, ক্ষমতার অপব্যবহার। এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দামী পোশাক উপহার দিয়ে অফিসে একা ডেকে নিয়ে হেনস্তা করার চেষ্টা করে—তিনি পালিয়ে বাঁচেন।

মিডিয়াতে আসেন মামা আক্তারুজ্জামান-এর মাধ্যমে। কিন্তু ‘হাস্কি’ কণ্ঠস্বরের কারণে নায়িকা হিসেবে সুযোগ কম। তবুও ‘এফএনএফ’, ‘আরমান ভাই’ নাটকে কাজ করে পরিচিতি পান। এখানেও ভালো কাজের বিনিময়ে ‘কোয়ালিটি টাইম’-এর প্রস্তাব ছিল বাস্তবতা।

সবচেয়ে বড় আঘাত আসে বিশ্বাস থেকে। বিদেশে যাওয়ার আশায় একজন প্রতারককে দিয়ে দেন ৭ লক্ষ টাকা ও মায়ের দেওয়া ১৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। সে সব নিয়ে উধাও হয়ে যায়।

আজ রিমু রোজা খন্দকার একা।
কোনো পরিবার নেই, নিরাপদ আশ্রয় নেই।
নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছেন, একটি ক্লদিং পেজ চালাচ্ছেন।

সাক্ষাৎকারের শেষে তার কথাটা ভয়ের—
এই এপিসোড প্রচার হওয়ার পর তিনি বেঁচে থাকবেন কি না, জানেন না।কারণ তিনি প্রভাবশালীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন।তার ভাষায়,“আমার পিছুটান আর নেই, যদি আমাকে মেরেও ফেলে অবাক হওয়ার কিছু নাই।”

এই গল্পটা সহানুভূতির জন্য নয়।
এই গল্পটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য—
একজন নারী একা হলে, এই সমাজ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে।আর আমরা যদি এসব শুনেও নীরব থাকি,
তাহলে দায় শুধু তাদের না—আমাদেরও।