Dhaka 11:15 pm, Saturday, 24 January 2026

নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভাঙচুর, দখলদারিত্ব এবং সুবিধাবাদী রাজনীতিতে টিপু

এম টি আর মাসুদ : নারায়ণগঞ্জে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভাঙচুর, দখলদারিত্ব এবং সুবিধাবাদী রাজনীতির মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব  আবু আল ইউসুফ খান টিপু। বিশেষ করে, নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নিয়ে তার বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য এবং সাংবাদিক নেতাদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনায় খোদ বিএনপির ভিতরে ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদ একটি সভায় সাবেক মেয়র আইভীর গ্রেপ্তারের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, “আইভী গডফাদারের বিরুদ্ধে ছিল, তাকে আমরা জেলে তুলেছি। তার কোন অপকর্ম নেই, আইভি ওসমান পরিবারের বিপক্ষে লড়তে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে।” সাংবাদিক নেতার এই সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য সহ্য করতে না পেরে টিপু ফেসবুকে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করে। তবে সাধারণ মানুষ টিপুর এই অবস্থানকে ‘মায়া কান্না’ ও ‘ব্যক্তিগত আক্রোশ’ হিসেবে দেখছে। টিপুর ঐ স্ট্যাটাসে শামীম আহমেদ নামে এক ব্যক্তি টিপুর ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেছে, “আপনি তো আগে মডেল মাসুদ ভাইকে দোসর বলেছিলেন, আর এখন টাকা পেয়ে সন্দেশ হিসেবে খাচ্ছেন। আপনার চরিত্রের কোনো দাম নেই।”

জানা গেছে, টিপুর বিরুদ্ধে অন্যতম বড় অভিযোগ উঠেছে, ওসমান পরিবারের সাথে তার রহস্যজনক আঁতাত নিয়ে। ৫ আগস্টের পর শামীম ওসমানের মূল আস্তানা ‘হীরা মহল’ অক্ষত রেখে, তার সৎ ভাইদের পৈত্রিক বাড়ি ‘বায়তুল আমান’ এক্সকাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নেতৃত্বে ছিল টিপু।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের প্রধান সম্পত্তি রক্ষা করতেই এই নাটক সাজানো হয়েছিল। এমনকি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাজনুর সাথে টিপুর পুরনো ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় তার ‘ওসমান-প্রীতি’ এখন ওপেন সিক্রেট।

তৃণমূলের অভিযোগ, বিএনপিকে কোণঠাসা করতে তৈরি হওয়া ‘বিএনএফ’-এর নারায়ণগঞ্জের মূল কারিগর ছিল এই টিপু। সে নিজে বিএনএফ-এর জেলা আহ্বায়ক ছিল। তার প্ররোচনাতেই উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা মাসুকুল ইসলাম রাজীব বিএনএফ-এর তালিকায় সদস্য সচিব হিসেবে নাম লিখিয়েছিল। জেলা বিএনপির বিগত সম্মেলনে রাজীবকে সেই পুরনো বিএনএফ সংশ্লিষ্টতার কারণে শোকজ করা হয় এবং সে সাধারণ সম্পাদক পদের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছিল। অথচ রাজীবকে ‘ভেজাল’ বানানো সেই টিপু নিজে বিএনএফ-এর প্রধান হোতা হয়েও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টিপুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। টিপুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরাও লজ্জিত। গত ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরের নবীগঞ্জে নিজের দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের হাতেই গণপিটুনির শিকার হয় এই সদস্য সচিব টিপু। পদ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং পরিবহন সেক্টর দখলের চেষ্টার কারণেই সে নিজ দলের ভেতরেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। গত ৪ ডিসেম্বর পরিবহন শ্রমিকরা তার বিরুদ্ধে রাজপথে মিছিল করে তার ইন্ধনে নেতা গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানায়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেখানে বারবার বলছে, “আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না, আমরা শান্তির রাজনীতি চাই,” সেখানে টিপু ও তার বলয়ের নেতারা ভাঙচুর এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থেকে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি, টিপুর মতো সুবিধাবাদী, বিএনএফ কানেকটেড এবং বিতর্কিত নেতাদের কারণে বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগ বৃথা যাচ্ছে। অবিলম্বে এই ‘হাইব্রিড’ ও ‘সুবিধাবাদী’ নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে নারায়ণগঞ্জে দলটির অস্তিত্ব চরম সংকটে পড়বে বলে মনে করছে সচেতন মহল।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Sadaia jahan

Popular Post

নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভাঙচুর, দখলদারিত্ব এবং সুবিধাবাদী রাজনীতিতে টিপু

Update Time : 04:56:28 am, Tuesday, 30 December 2025

এম টি আর মাসুদ : নারায়ণগঞ্জে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভাঙচুর, দখলদারিত্ব এবং সুবিধাবাদী রাজনীতির মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব  আবু আল ইউসুফ খান টিপু। বিশেষ করে, নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নিয়ে তার বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য এবং সাংবাদিক নেতাদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনায় খোদ বিএনপির ভিতরে ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদ একটি সভায় সাবেক মেয়র আইভীর গ্রেপ্তারের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, “আইভী গডফাদারের বিরুদ্ধে ছিল, তাকে আমরা জেলে তুলেছি। তার কোন অপকর্ম নেই, আইভি ওসমান পরিবারের বিপক্ষে লড়তে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে।” সাংবাদিক নেতার এই সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য সহ্য করতে না পেরে টিপু ফেসবুকে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করে। তবে সাধারণ মানুষ টিপুর এই অবস্থানকে ‘মায়া কান্না’ ও ‘ব্যক্তিগত আক্রোশ’ হিসেবে দেখছে। টিপুর ঐ স্ট্যাটাসে শামীম আহমেদ নামে এক ব্যক্তি টিপুর ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেছে, “আপনি তো আগে মডেল মাসুদ ভাইকে দোসর বলেছিলেন, আর এখন টাকা পেয়ে সন্দেশ হিসেবে খাচ্ছেন। আপনার চরিত্রের কোনো দাম নেই।”

জানা গেছে, টিপুর বিরুদ্ধে অন্যতম বড় অভিযোগ উঠেছে, ওসমান পরিবারের সাথে তার রহস্যজনক আঁতাত নিয়ে। ৫ আগস্টের পর শামীম ওসমানের মূল আস্তানা ‘হীরা মহল’ অক্ষত রেখে, তার সৎ ভাইদের পৈত্রিক বাড়ি ‘বায়তুল আমান’ এক্সকাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নেতৃত্বে ছিল টিপু।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের প্রধান সম্পত্তি রক্ষা করতেই এই নাটক সাজানো হয়েছিল। এমনকি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাজনুর সাথে টিপুর পুরনো ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় তার ‘ওসমান-প্রীতি’ এখন ওপেন সিক্রেট।

তৃণমূলের অভিযোগ, বিএনপিকে কোণঠাসা করতে তৈরি হওয়া ‘বিএনএফ’-এর নারায়ণগঞ্জের মূল কারিগর ছিল এই টিপু। সে নিজে বিএনএফ-এর জেলা আহ্বায়ক ছিল। তার প্ররোচনাতেই উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা মাসুকুল ইসলাম রাজীব বিএনএফ-এর তালিকায় সদস্য সচিব হিসেবে নাম লিখিয়েছিল। জেলা বিএনপির বিগত সম্মেলনে রাজীবকে সেই পুরনো বিএনএফ সংশ্লিষ্টতার কারণে শোকজ করা হয় এবং সে সাধারণ সম্পাদক পদের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছিল। অথচ রাজীবকে ‘ভেজাল’ বানানো সেই টিপু নিজে বিএনএফ-এর প্রধান হোতা হয়েও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টিপুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। টিপুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরাও লজ্জিত। গত ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরের নবীগঞ্জে নিজের দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের হাতেই গণপিটুনির শিকার হয় এই সদস্য সচিব টিপু। পদ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং পরিবহন সেক্টর দখলের চেষ্টার কারণেই সে নিজ দলের ভেতরেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। গত ৪ ডিসেম্বর পরিবহন শ্রমিকরা তার বিরুদ্ধে রাজপথে মিছিল করে তার ইন্ধনে নেতা গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানায়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেখানে বারবার বলছে, “আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না, আমরা শান্তির রাজনীতি চাই,” সেখানে টিপু ও তার বলয়ের নেতারা ভাঙচুর এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থেকে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি, টিপুর মতো সুবিধাবাদী, বিএনএফ কানেকটেড এবং বিতর্কিত নেতাদের কারণে বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগ বৃথা যাচ্ছে। অবিলম্বে এই ‘হাইব্রিড’ ও ‘সুবিধাবাদী’ নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে নারায়ণগঞ্জে দলটির অস্তিত্ব চরম সংকটে পড়বে বলে মনে করছে সচেতন মহল।