Dhaka 8:23 am, Tuesday, 10 February 2026

বরিশাল পাসপোর্ট অফিসে চলছে দুর্নীতি

উম্মে হানি মায়া : বরিশাল পাসপোর্ট অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্নীতির অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় এবং অফিসের অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, উপ-পরিচালক রোজী খন্দকার, সহকারী-মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর সাদ্দাম হোসেনের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম ও দফায় দফায় অবৈধ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

নাগরিকদের অভিযোগ, পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী যেখানে নাগরিককে নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়, সেখানে অফিসের কিছু কর্মকর্তা অনৈতিকভাবে ‘সুবিধা’ বা ‘দ্রুত প্রক্রিয়া’ নামের নামে অতিরিক্ত টাকা দাবি করছে। অনেকের অভিযোগ, কেউ সরকারি নিয়ম মেনে আবেদন করলেও পাসপোর্ট প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে এবং তা সহজে দেওয়ার জন্য অর্থের চাপ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় এক নাগরিক জানায়, “আমি নিয়ম মেনে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু অফিস থেকে বারবার ফোন দিয়ে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার চাপ দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে দিতে হয় না দিলে আবেদন আটকে থাকে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল পাসপোর্ট অফিসের আশেপাশের কম্পিউটার ও কপি দোকানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন অফিসের কর্মকর্তারা। দোকানগুলোকে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে দিলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বুঝে যায়, কোন আবেদন বা কপি আগে প্রক্রিয়া করতে হবে। আর যদি চিহ্ন না থাকে, নাগরিকদের নানা জটিলতা ও বিলম্বের মুখোমুখি হতে হয়।

এই প্রক্রিয়ার ফলে, যেখানে যে দোকান থেকে আবেদন বা কপি করা হবে, তা অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগে থেকে সমন্বয় করা থাকে। সাধারণ নাগরিকরা দ্রুত পাসপোর্ট পেতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, “নির্দিষ্ট দোকান ব্যবহার না করলে আবেদন আটকে যায়, বাধ্য হয়ে কমিশন দিতে হয়। এভাবে সরকারি সেবার স্বাভাবিক নিয়মকে উল্টে দেওয়া হচ্ছে।”

অফিসের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, অনিয়মের মূল কেলেঙ্কারি চলছে উপ-পরিচালক এবং সহকারী পরিচালকের হাত ধরে। সহকারী-মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য কার্যত ‘মধ্যস্থকারীর’ ভূমিকা পালন করছে। তারা পাসপোর্ট সংক্রান্ত নথি ও তথ্য অজান্তে পরিবর্তন করে দ্রুত প্রক্রিয়ার নামে অর্থ আদায় করছে।

একই সময়, বিভিন্ন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছে, “সরকারি অফিসে এমন কেলেঙ্কারির দায় কে নেবে?”

একজন নাগরিক বলে, “আমি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো অফিসের কাছে থাকা নির্দিষ্ট দোকান থেকে সার্ভিস নিতে। অন্য দোকান হলে আবেদন আটকে যায়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছে, সরকারি অফিসে এই ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা না গেলে সাধারণ নাগরিকদের পাসপোর্টসহ অন্যান্য সেবায় বাধার মুখোমুখি হতে হবে। তারা আরও বলেছেন, নিয়মিত স্বচ্ছতা যাচাই, নাগরিকের অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অফিসের অভ্যন্তরীণ কন্ট্রোল ব্যবস্থা শক্ত করা জরুরি।

বরিশালের স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতারা এই অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, “সরকারি সেবা গ্রহণে যদি সাধারণ মানুষকে দুর্নীতি দিতে হয়, তাহলে দেশের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”

এভাবে বরিশাল পাসপোর্ট অফিসে চলমান দুর্নীতি শুধুমাত্র অফিসের অভ্যন্তরীণ নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নাগরিকদের আস্থা হ্রাস পাবে এবং সরকারি সেবার প্রতি অবিশ্বাস আরও বাড়বে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Sadaia jahan

বরিশাল পাসপোর্ট অফিসে চলছে দুর্নীতি

Update Time : 03:56:13 pm, Saturday, 24 January 2026

উম্মে হানি মায়া : বরিশাল পাসপোর্ট অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্নীতির অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় এবং অফিসের অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, উপ-পরিচালক রোজী খন্দকার, সহকারী-মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর সাদ্দাম হোসেনের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম ও দফায় দফায় অবৈধ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

নাগরিকদের অভিযোগ, পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী যেখানে নাগরিককে নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়, সেখানে অফিসের কিছু কর্মকর্তা অনৈতিকভাবে ‘সুবিধা’ বা ‘দ্রুত প্রক্রিয়া’ নামের নামে অতিরিক্ত টাকা দাবি করছে। অনেকের অভিযোগ, কেউ সরকারি নিয়ম মেনে আবেদন করলেও পাসপোর্ট প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে এবং তা সহজে দেওয়ার জন্য অর্থের চাপ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় এক নাগরিক জানায়, “আমি নিয়ম মেনে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু অফিস থেকে বারবার ফোন দিয়ে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার চাপ দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে দিতে হয় না দিলে আবেদন আটকে থাকে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল পাসপোর্ট অফিসের আশেপাশের কম্পিউটার ও কপি দোকানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন অফিসের কর্মকর্তারা। দোকানগুলোকে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে দিলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বুঝে যায়, কোন আবেদন বা কপি আগে প্রক্রিয়া করতে হবে। আর যদি চিহ্ন না থাকে, নাগরিকদের নানা জটিলতা ও বিলম্বের মুখোমুখি হতে হয়।

এই প্রক্রিয়ার ফলে, যেখানে যে দোকান থেকে আবেদন বা কপি করা হবে, তা অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগে থেকে সমন্বয় করা থাকে। সাধারণ নাগরিকরা দ্রুত পাসপোর্ট পেতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, “নির্দিষ্ট দোকান ব্যবহার না করলে আবেদন আটকে যায়, বাধ্য হয়ে কমিশন দিতে হয়। এভাবে সরকারি সেবার স্বাভাবিক নিয়মকে উল্টে দেওয়া হচ্ছে।”

অফিসের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, অনিয়মের মূল কেলেঙ্কারি চলছে উপ-পরিচালক এবং সহকারী পরিচালকের হাত ধরে। সহকারী-মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য কার্যত ‘মধ্যস্থকারীর’ ভূমিকা পালন করছে। তারা পাসপোর্ট সংক্রান্ত নথি ও তথ্য অজান্তে পরিবর্তন করে দ্রুত প্রক্রিয়ার নামে অর্থ আদায় করছে।

একই সময়, বিভিন্ন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছে, “সরকারি অফিসে এমন কেলেঙ্কারির দায় কে নেবে?”

একজন নাগরিক বলে, “আমি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো অফিসের কাছে থাকা নির্দিষ্ট দোকান থেকে সার্ভিস নিতে। অন্য দোকান হলে আবেদন আটকে যায়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছে, সরকারি অফিসে এই ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা না গেলে সাধারণ নাগরিকদের পাসপোর্টসহ অন্যান্য সেবায় বাধার মুখোমুখি হতে হবে। তারা আরও বলেছেন, নিয়মিত স্বচ্ছতা যাচাই, নাগরিকের অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অফিসের অভ্যন্তরীণ কন্ট্রোল ব্যবস্থা শক্ত করা জরুরি।

বরিশালের স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতারা এই অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, “সরকারি সেবা গ্রহণে যদি সাধারণ মানুষকে দুর্নীতি দিতে হয়, তাহলে দেশের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”

এভাবে বরিশাল পাসপোর্ট অফিসে চলমান দুর্নীতি শুধুমাত্র অফিসের অভ্যন্তরীণ নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নাগরিকদের আস্থা হ্রাস পাবে এবং সরকারি সেবার প্রতি অবিশ্বাস আরও বাড়বে।