
মনে পড়ে নির্ভয়ার বন্ধুকে???
সে মরিয়া লড়াই চালিয়েছিল বান্ধবীকে বাঁচাতে…!
আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগে, ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, চোখের সামনে দেখেছিল চলন্ত বাসে তাঁর বান্ধবীকে ধর্ষিত হতে। লোহার রডের নির্বিচার আঘাতে অজ্ঞান হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সে মরিয়া লড়াই চালিয়েছিল বান্ধবীকে বাঁচাতে। কিন্তু পারে নি।
জ্ঞান হারানোর আগেই টের পেয়েছিল ঐ ছয় নরপশু তাঁর পা ভেঙ্গে দিয়েছে, টাকাপয়সা কেড়ে নিয়েছে, সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর, ছিঁড়ে টুকরো করে দিয়েছে পরনের জামা-প্যান্ট।
পুরোপুরি জ্ঞান ফেরার আগেই চলন্ত বাস থেকে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলা হলো জনমানবশূন্য
রাস্তায়। দিল্লীর ডিসেম্বরের শীতের রাতে অর্ধনগ্ন, অর্ধমৃত অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে থাকার সময়ই বুঝতে পারলো পাশেই ছিটকে এসে আছড়ে পড়ল তাঁর বান্ধবী।
তখন তাঁরা দু’জনই প্রায় নগ্ন, বিধ্বস্ত, গুরুতর আহত, ভিন্ন ভিন্ন কারনে রক্তাক্ত। কানে আসছে মৃত্যুঘন্টা। তার মধ্যেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। দেখলো,বান্ধবীর সারা শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। সম্পূর্ণ অচেতন, নিরাবরন।
বাঁচাতে হবে বান্ধবীকে, এই তাগিদটা ওই অসহায় অবস্থাতেও তাঁকে তাড়া দিল। ভাঙা পা নিয়ে কোনওক্রমে উঠে দাঁড়ালো সে। একের পর এক গাড়ীকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করল।বান্ধবীর শরীরটা ঢাকার জন্য একটা চাদর ভিক্ষা চাইলো গাড়ীওয়ালা ‘বাবু-বিবিদের’ কাছে। কেউ সাড়া দিল না। শারীরিক ওই অবস্থাতে অবশেষে প্রায় 40 মিনিট চেষ্টা চালানোর পর, একটা গাড়ীকে দাঁড় করাতে পারল।
ভাঙা পা, গায়ে জামাকাপড় প্রায় নেই। একটা টাকা সঙ্গে নেই। সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। তবুও নিজের কথা না ভেবে, অচেতন বান্ধবীকে পাঁজাকোলা করে তুলে সে ঢুকলো এক হাসপাতালে। ভর্তি করালো বান্ধবীকে। পুলিশে খবর দিল। বান্ধবীর বাবা-মাকে হাসপাতালে আসতে বলল। তখনও তাঁর শরীর থেকে রক্ত ঝরেই চলেছে। অর্ধমৃত অবস্থাতেও বান্ধবীকে বাঁচাতে সব কাজ করার পর আর পারলো না, জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো ওই হাসপাতাল চত্বরেই।
একজন বন্ধুকে বাঁচাতে প্রকৃত এক বন্ধুর যা করা উচিত, তার থেকেও বোধহয় বেশী কিছুই সে করল ওই আধমরা অবস্থাতেই।
অথচ সিনেমার মতো এমন কিছু তো নাও হতে পারতো সেই অভিশপ্ত রাতে ।
○ বাসের মধ্যেই যখন বুঝলো ঝামেলায় জড়াতে চলেছি, বান্ধবীকে ফেলে পালিয়ে যেতে পারতো। সে পালায় নি।
○ জনমানবশূন্য রাস্তায় যখন তাঁদের ছুঁড়ে ফেলা হলো, তখন তাঁর জ্ঞান থাকলেও বান্ধবী অজ্ঞান। সেই অবস্থায় বান্ধবীকে ফেলে পালিয়ে যেতে পারতো। সে পালায় নি।
○ হাসপাতালের গেটে অচেতন বান্ধবীকে ফেলে রেখে সে পালিয়ে যেতে পারতো অনায়াসে।সে পালায় নি।
○ পুলিশের ঝামেলা এড়াতে সে নিজে পুলিশে খবর নাও দিতে পারতো। সে নিজেই খবর দিলো পুলিশে। সে এড়িয়ে যায় নি।
○ বান্ধবীর বাবা-মাকে খবর দিলে, তাঁর বিরুদ্ধেই যাবতীয় অভিযোগের তির ধেয়ে আসতে পারে, সে জানতো। তবুও বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে খবর দিলো বাবা-মাকে। সে এড়িয়ে যায় নি।
○ অসম-সাহসিক এই কাজের বিনিময়ে উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া আর্থিক সাহায্য বা চাকরি সে নিতেই পারতো। বান্ধবীর বাবা-মা তো তাঁর চোখের সামনেই সরকারের কাছ থেকে 25 লক্ষ টাকা এবং বান্ধবীর ভাইয়ের চাকরি নিয়েছেন। তা ছাড়াও দেশ-বিদেশের হাজারো ব্যক্তি বা সংগঠনের কাছ থেকে, মেয়ের নামে পেয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকার সহায়তা। সে কিন্তু সবার সব সাহায্যের প্রস্তাব, সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়ে ছিল।কারন, বন্ধুত্বের সঙ্গে স্বার্থকে সে মেশাতে পারে নি।
○ ওই অর্ধমৃত অবস্থাতেও বান্ধবীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে অসমসাহসিক কাজ করার জন্য দেশজোড়া নাম বা স্বীকৃতিও সে দাবি করতে পারতো। সে ওই পথেই হাঁটে নি। আজ, পাঁচ বছর পরেই বা কতজন মানুষ তাঁর নাম জানেন।
○ নিজের চিকিৎসার জন্য সরকারি সাহায্য তো নিতেই পারতেন। একটা পয়সার সাহায্যও সে নেয়নি।
○ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চ্যানেলে সেই সময় লাগাতর মুখ দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করতে পারতো। করে নি। আজই বা ক’টা লোক তাঁর মুখ চেনেন?
এটাও যদি বন্ধুত্ব না হয়, তাহলে কাকে বলে বন্ধুত্ব ?
গোটা দেশ যখন মেয়েটির জন্য সঙ্গত কারনেই গর্জে উঠেছে, তখন একবারের জন্যও কেউ ভাবেনি, এই ছেলেটি সেদিন তাঁর বান্ধবীকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে গেলে, আজও কেউ জানতে পারতো না সে রাতের কাহিনী।
আজও কেউ জানতে চায় নি সেই রাতে এই ছেলেটির মনের অবস্থা কেমন ছিল। কেউ ভাবেনি ওই অর্ধমৃত ছেলেটির শরীরে কিসের টানে সে রাতে অতিমানবিক এক শক্তি ভর করেছিল।
কেউ ভাবে নি কিসের টানে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর বান্ধবীর ধর্ষিত শরীরটা নিয়ে অসাধ্য সাধনের চেষ্টায় ঝাঁপিয়েছিল।
এটাও যদি বন্ধুত্ব না হয়, তাহলে কাকে বলে বন্ধুত্ব ?
ছবিঃ নির্ভয়ার বন্ধু অবনীন্দ্র প্রতাপ পাণ্ডে
।।সংগৃহীত।।
Reporter Name 















