Dhaka 9:45 am, Tuesday, 10 February 2026

স্ত্রীকে হারানোর শোক তখনও কাটেনি, শুরু ভোগান্তি!

মোর্শেদা আক্তার সাথী : স্বামীর স্ত্রীকে হারানোর শোক তখনও কাটেনি, শুরু ভোগান্তির কাহিনী। মৃত স্ত্রীর পেনশনের টাকা পেতে টানা তিন মাস ধরে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরেছে এক অসহায় স্বামী। স্ত্রীকে হারানোর শোক তখনো কাটেনি। এর মধ্যেই শুরু হয় ভোগান্তি ও আরেক জীবন যুদ্ধ, বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ নুরুন্নবী।তার স্ত্রী শিরীন আক্তার, গাছা কাওডিয়া এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষকা ছিল।গত ২৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে স্কুল শিক্ষকা  ইন্তেকাল করে। আইন অনুযায়ী স্বামীর প্রাপ্য ছিল স্ত্রীর পেনশনের টাকা।কিন্তু সেই ন্যায্য অধিকার পেতেই শুরু হয় এক নির্মম ভোগান্তি।

নুরুন্নবী জানান—বারবার অফিসে গেলেও তার ফাইল এগোচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়—“টাকা না দিলে ফাইল নড়বে না।”এক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে—তিনি পেনশনের ফাইল ফরোয়ার্ড করবে না যতক্ষণ না “বোঝাপড়া” হয়।অসহায় মানুষটি প্রথমে কিছু টাকা দেয়। ভেবেছিল, হয়তো এখানেই শেষ।কিন্তু শেষ হয়নি।একটার পর একটা দাবি আসতে থাকে দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে।এমনকি অভিযোগ করা হয়, অন্য এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে মৃত স্ত্রীর বেতন কাঠামো কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নুরুন্নবী বলেন, “আমার স্ত্রী মারা গেছে।আগে দুইজনের বেতনে সংসার চলত,এখন একজনের আয়ে কষ্টে চলছি।আমার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই।”কিন্তু সেই কষ্টের কথাও কেউ শুনতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত দাবি করা হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ।মানসিক চাপ, অপমান আর অসহায়ত্ব সব মিলিয়ে নুরুন্নবী সিদ্ধান্ত নেয়,আইনের দ্বারস্থ হওয়ার। সে অভিযোগ করে দুর্নীতি দমন কমিশনে। অভিযোগ পাওয়ার পর দুদকের একটি বিশেষ দল ফাঁদ পাতে।

বুধবার বিকেলে নির্ধারিত টাকা নিয়ে যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যায় নুরুন্নবী। যেই মুহূর্তে ১,২০,০০০ টাকা হাত বদল হয় এবং সেই টাকা কর্মকর্তার ড্রয়ারে রাখা হয়—ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে থাকা দুদকের টিম অভিযান চালায়। হাতে নাতে ঘুষের টাকাসহ আটক হয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। দুদক, যশোরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আল আমিন জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নুরুন্নবী আরও জানান, এর আগেও সে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছিল।একজন স্বামী যে স্ত্রী হারিয়ে একা হয়ে গেছে তার প্রাপ্য টাকা পেতেই এভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তাকে। এই ঘটনা শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটা আমাদের সমাজের এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

যেখানে দুঃখ, অসহায়ত্ব আর ন্যায্য অধিকার,সবকিছুর মাঝেই কিছু মানুষ সুযোগ খোঁজে। তবে এই ঘটনায় একটি বার্তা স্পষ্ট যে, অন্যায় যত শক্তই হোক,আইনের সামনে শেষ পর্যন্ত তাকে দাঁড়াতেই হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের নতুন  দলীয় সরকার কি করে নির্বাচনের পর তাই দেখার আশা বাংলাদেশীদের।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Sadaia jahan

স্ত্রীকে হারানোর শোক তখনও কাটেনি, শুরু ভোগান্তি!

Update Time : 06:27:27 pm, Thursday, 29 January 2026

মোর্শেদা আক্তার সাথী : স্বামীর স্ত্রীকে হারানোর শোক তখনও কাটেনি, শুরু ভোগান্তির কাহিনী। মৃত স্ত্রীর পেনশনের টাকা পেতে টানা তিন মাস ধরে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরেছে এক অসহায় স্বামী। স্ত্রীকে হারানোর শোক তখনো কাটেনি। এর মধ্যেই শুরু হয় ভোগান্তি ও আরেক জীবন যুদ্ধ, বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ নুরুন্নবী।তার স্ত্রী শিরীন আক্তার, গাছা কাওডিয়া এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষকা ছিল।গত ২৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে স্কুল শিক্ষকা  ইন্তেকাল করে। আইন অনুযায়ী স্বামীর প্রাপ্য ছিল স্ত্রীর পেনশনের টাকা।কিন্তু সেই ন্যায্য অধিকার পেতেই শুরু হয় এক নির্মম ভোগান্তি।

নুরুন্নবী জানান—বারবার অফিসে গেলেও তার ফাইল এগোচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়—“টাকা না দিলে ফাইল নড়বে না।”এক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে—তিনি পেনশনের ফাইল ফরোয়ার্ড করবে না যতক্ষণ না “বোঝাপড়া” হয়।অসহায় মানুষটি প্রথমে কিছু টাকা দেয়। ভেবেছিল, হয়তো এখানেই শেষ।কিন্তু শেষ হয়নি।একটার পর একটা দাবি আসতে থাকে দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে।এমনকি অভিযোগ করা হয়, অন্য এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে মৃত স্ত্রীর বেতন কাঠামো কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নুরুন্নবী বলেন, “আমার স্ত্রী মারা গেছে।আগে দুইজনের বেতনে সংসার চলত,এখন একজনের আয়ে কষ্টে চলছি।আমার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই।”কিন্তু সেই কষ্টের কথাও কেউ শুনতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত দাবি করা হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ।মানসিক চাপ, অপমান আর অসহায়ত্ব সব মিলিয়ে নুরুন্নবী সিদ্ধান্ত নেয়,আইনের দ্বারস্থ হওয়ার। সে অভিযোগ করে দুর্নীতি দমন কমিশনে। অভিযোগ পাওয়ার পর দুদকের একটি বিশেষ দল ফাঁদ পাতে।

বুধবার বিকেলে নির্ধারিত টাকা নিয়ে যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যায় নুরুন্নবী। যেই মুহূর্তে ১,২০,০০০ টাকা হাত বদল হয় এবং সেই টাকা কর্মকর্তার ড্রয়ারে রাখা হয়—ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে থাকা দুদকের টিম অভিযান চালায়। হাতে নাতে ঘুষের টাকাসহ আটক হয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। দুদক, যশোরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আল আমিন জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নুরুন্নবী আরও জানান, এর আগেও সে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছিল।একজন স্বামী যে স্ত্রী হারিয়ে একা হয়ে গেছে তার প্রাপ্য টাকা পেতেই এভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তাকে। এই ঘটনা শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটা আমাদের সমাজের এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

যেখানে দুঃখ, অসহায়ত্ব আর ন্যায্য অধিকার,সবকিছুর মাঝেই কিছু মানুষ সুযোগ খোঁজে। তবে এই ঘটনায় একটি বার্তা স্পষ্ট যে, অন্যায় যত শক্তই হোক,আইনের সামনে শেষ পর্যন্ত তাকে দাঁড়াতেই হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের নতুন  দলীয় সরকার কি করে নির্বাচনের পর তাই দেখার আশা বাংলাদেশীদের।